Header Ads Widget

নাফ যুদ্ধ ২০০০


বহু বছর ধরে ফল্গুধারার মতো বিরাজিত হলেও ২০০৮ সাল থেকে দক্ষিণ সীমান্ত হঠাৎ করে থেকে থেকে অশান্তি দেখা দিতে শুরু করে। সেবার অচিহ্নিত সীমান্তে বাংলাদেশের দাবি করা সমুদ্রসীমার মধ্যে ব্রহ্মদেশ তেল-গ্যাস অনুসন্ধান চালানোর চেষ্টা করে। এ সময় বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিনের দক্ষিণে খনিজ অনুসন্ধান কাজ অব্যাহত রাখার জন্য বার্মা নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠালে দুদেশের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। জবাবে বাংলাদেশও উপদ্রুত এলাকায় চারটি যুদ্ধজাহাজ পাঠায় এবং সীমান্তে সেনা সমাবেশ করে। এক পর্যায়ে নৌবাহিনীর রণতরী বিএনএস উমর ফারুক ধাওয়া করে খনিজ অনুসন্ধানের একটি দলকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম হয়।

এই নিয়ে ২০০৮ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই যুদ্ধাবস্থা শুরুর মতো উত্তেজনা শুরু হয়ে যায়। আমার মনে আছে, তখন কিছুক্ষণ পরপরই ঢাকার আকাশে উড়ন্ত জঙ্গিবিমানের আওয়াজ শোনা যেতো। দক্ষিণে বাংলাদেশের সামরিক উপস্থিতি তখন ছিলোনা বললেই চলে। জরুরী ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাদল এনে কক্সবাজারের ইনানি থেকে শুরু করে রামু পর্যন্ত পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে অস্থায়ী ফাঁড়ী সৃষ্টি করে সেনা মোতায়েন করা হয়েছিলো। ২০১১ সালে কক্সবাজার ভ্রমণে গিয়ে এমন কিছু পরিত্যক্ত ফাঁড়ী আমি দেখেছিলাম। এরপর অত্র এলাকায় একটি শক্তিশালী পদাতিক ডিভিশন স্থাপনের কাজ শুরু হয়। যার ধারাবাহিকতায় রামুতে স্থাপিত হয়েছে দশম পদাতিক ডিভিশন।

বাংলাদেশ ও ব্রহ্মদেশের মধ্যে বৈরিতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে ২০১২ সালে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা গণহত্যা থেকে। এরপর থেকে চলেই যাচ্ছে। এর মধ্যে কখনো কখনো দুই দেশ সংক্ষিপ্ত সীমান্ত সংঘাতে জড়িত হয়েছে। এখনও বার্মার বিরুদ্ধে শক্ত সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার দাবী বিরাজমান। এই দাবী এতোটা সুদূরে পৌঁছেছে যে, কিছুদিন আগেও এক বিদেশী রাষ্ট্রদূতের সাথে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী আরাকান সংকটের সামরিক সমাধানের বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

যাহোক, বাংলাদেশ ও ব্রহ্মদেশের মধ্যকার যেকোনো উত্তেজনার বিষয়ে যখনই আলোচনা আসবে, তখনই অবধারিতভাবে চলে আসবে নাফ যুদ্ধের কথা। ২০০০ সালের ৮ জানুয়ারী এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো। তিন দিনের এই সামরিক সংঘাতে নজিরবিহীনভাবে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশ রাইফেলসের ২৫০০ সৈন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো ব্রহ্মদেশের সেনা ও নৌবাহিনীর দুই ডিভিশন সৈন্যের সামনে, যাদের সম্মিলিত লোকবল ছিল ২৫০০০ এর মতো।

নাফ যুদ্ধের পটভূমি

আজ থেকে আঠারো বছর আগে নাফ নদীর তীরে সংঘটিত যুদ্ধের বেশ প্রলম্বিত একটি পটভূমি ছিল। ১৯৬৬ সালে সীমান্ত নিষ্পত্তিকরণের সময় তৎকালীন পাকিস্তান ও বার্মা সরকার একটি চুক্তিতে উপনীত হয়। এই চুক্তির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সমসাময়িক সময়ের নাফ নদীর খাতের মধ্যস্থিত অংশকে দুই দেশের সীমান্ত রূপে নির্দিষ্ট করা হয়। ব্রহ্মদেশের অংশে নাফ নদীর বারোটি প্রশাখা আছে। চুক্তি অনুযায়ী বার্মা সেই প্রশাখাসমূহে এমন কোন পদক্ষেপ নিতে পারতো না, যা নাফ নদীর গতিপথে বড়সড় পরিবর্তন আনতে না পারে। কারণ সবকিছুর উপরে নাফ নদীর খাতের মধ্যভাগকেই আন্তর্জাতিক সীমারেখা হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছিলো।

কিন্তু রেঙ্গুন এই চুক্তি অগ্রাহ্য করে ২০০০ সাল নাগাদ বারোটির মধ্যে এগারোটিতেই বাঁধ নির্মাণ করে। এতে করে নাফ নদীর মূল প্রবাহ বাংলার দিকে সরে আসে, এবং প্রায় ২৫০০ একর ভূখণ্ড বাংলাদেশ হারিয়ে ফেলে। ২০০০ সালে বার্মা সর্বশেষ প্রশাখাতেও বাঁধ দিতে উদ্যোগী হলে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে বাদানুবাদের সূত্রপাত হয়। কয়েক দফা দুই দেশের মধ্যে উত্তপ্ত ও অশোভন ভাষায় চিঠি চালাচালিও হয়। এই বাঁধ হয়ে গেলে নাফ নদীর বাংলাদেশ অংশে ভাঙ্গনের সৃষ্টি হতো, যা টেকনাফ শহরের অস্তিত্ব বিলীন করে দিতে পারতো।

১৯৯৯ সালের শেষ নাগাদ কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বাঁধ দেয়ার প্রচেষ্টা ভণ্ডুল করে দেয়া ছাড়া অন্য কোন রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। গোপনে প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় যুদ্ধের।

ওয়াকেয়া

তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমানের জবানীতে জানা যায় এই যুদ্ধের প্রারম্ভিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি প্রসঙ্গে। অবস্থানগত দিক থেকে বাংলাদেশের সামরিক অবস্থান ছিল বর্মীদের অবস্থানের থেকে কিছুটা নিচে। এটা একটা অসুবিধাজনক বিষয় হলেও জেনারেল ফজলুর রহমান সম্ভাব্য যুদ্ধের নির্ধারণকারী বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন গোলাবারুদের পর্যাপ্ততাকে। তাঁর মতে পর্যাপ্ত গোলাবারুদের সরবরাহ নিশ্চিত থাকলেও বাংলাদেশের জয় অনেকটা নিশ্চিত হয়ে পড়বে। এই লক্ষ্যে অসম সাহসিকতার সাথে তিনি এক রাতে মর্টারের গোলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরণের পঁচিশ লাখ গোলাবারুদ কক্সবাজারে পাঠিয়ে দেন। এর মধ্যে অর্ধেক তিনি কক্সবাজারে মোতায়েন রাখার আদেশ দেন, আর বাকি গোলাবারুদ অকুস্থলে পাঠিয়ে দেন। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সীমান্তে মোতায়েন করে অভিযানের দিকনির্দেশনা প্রদান করেন মহাপরিচালক স্বয়ং।

যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো ৮ তারিখ দুপুর আড়াইটায়। জেনারেল ফজলুর রহমান সেদিন নিয়মিত সীমান্ত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে দিনাজপুরে অবস্থান করছিলেন। সেখান থেকেই তিনি কোড ওয়ার্ডের মাধ্যমে অপারেশন শুরুর আদেশ দেন। কোড ওয়ার্ড ছিল সরল এক শব্দ- বিসমিল্লাহ।

যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো টেকনাফের হোয়াইকং ইউনিয়নে তোতার দ্বীপ সংলগ্ন অঞ্চলে। এখানে নাফ নদীর একটি বাঁকের সামনে প্রথম গুলি শুরু করে বিডিআর। অর্থাৎ এটি ছিল একটি আক্রমণাত্মক এঙ্গেজমেন্ট। দেশী-বিদেশী প্রচার মাধ্যম গুরুত্বের সাথে এই যুদ্ধের খবরাখবর প্রদান করে।

লাল কালিতে চিহ্নিত অংশেই মূলত শুরু হয়েছিলো নাফ যুদ্ধ। জায়গাটা টেকনাফ শহরের থেকে বেশ খানিকটা উজানে। এখানে বনভূমি কিছুটা পাতলা ও বার্মার অংশে এখানের শুরু হয়েছে পাহাড়। এসব পাহাড় বর্মীদের জন্য সুবিধাজনক হলেও শেষমেশ তাদের শোচনীয় পরাজয় রুখতে পারেনি।
যুদ্ধ শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই জয়-পরাজয় স্পষ্ট হয়ে যেতে থাকে। বার্মার ভেতরে অনুপ্রবিষ্ট গোয়েন্দারা প্রতিপক্ষের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির খবর আনতে থাকে। প্রায় ছয় শতাধিক সৈন্য, ও বাঁধ নির্মাণের শ্রমিক বিডিআরের এই হামলায় বেঘোরে মারা যায়। 

এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পেছনে ছিল জেনারেল ফজলুর রহমানের এক অভিনব পরিকল্পনা। তিনি এলিমেন্ট অভ সারপ্রাইজ অথবা ঝুঁকিপূর্ণ মাইন্ড গেম, নিয়তেই ভেবে থাকুন না কেন, তিনি ইচ্ছা করেই দুপুরকে আক্রমণ শুরুর সময় হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন। আমার মতে, এর পেছনে দুটি কারণ ক্রিয়াশীল ছিল। প্রথমত, সাধারণত কোন সামরিক হামলা ভোরবেলা অথবা রাতেই সংঘটিত হয়ে থাকে। দুপুরে আক্রমণ শুরু করা কিছুটা নজিরবিহীন। দ্বিতীয়ত, মনস্তাত্ত্বিকভাবে মানুষ দুপুরের দিকে শরীরবৃত্তীয় কারণেই কিছুটা শৈথিল্যে থাকে। আর শীতের দুপুরে এই শৈথিল্য আরও বেশি প্রতিভাত হয়। যাহোক, জেনারেল ফজলুর রহমানের এহেন হিসাবনিকাশ কার্যকর বলেই প্রমাণিত হয়।

যুদ্ধে বার্মার সেনা সমাবেশ ও হতাহতের খবর গোয়েন্দা সূত্রে প্রাপ্ত। যুদ্ধের কিছু আগেই বেশ কিছু গোয়েন্দাকে বার্মায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিলো তথ্য সংগ্রহের জন্য। তাদের থেকেই পাওয়া যায় একজন মেজর জেনারেল ও একজন রিয়ার এডমিরালের অধীনে বার্মার নিয়মিত বাহিনীর ২৫০০০ সৈন্য মোতায়েনের। সেই তুলনায় বাংলাদেশের সামরিক প্রস্তুতি ছিল খুবই অপ্রতুল। সেই সময় বাংলাদেশের প্রধান সেনাপতি ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল হারুনুর রশিদ। তিনি এই সংঘাতে জড়াতে ইচ্ছুক ছিলেন না। ফলে এই যুদ্ধের যাবতীয় দায়ভার বিডিআরের উপরই বর্তায়। ২৫০০০ নিয়মিত সেনার বিরুদ্ধে ২৫০০ জানবাজ আধাসামরিক বাহিনীর সৈন্য যুদ্ধে লিপ্ত হন।

যুদ্ধ শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রেঙ্গুনের কর্তাব্যক্তিদের টনক নড়ে। ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তা স্টেট পিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল নামের একটি পরিষদের মাধ্যমে ব্রহ্মদেশ শাসন করতো। এই পরিষদের চেয়ারম্যান সিনিয়র জেনারেল থান শোয়ে ছিলেন বার্মার শীর্ষ নেতা। তিনি একাধারে ছিলেন ব্রহ্মদেশের সরকার প্রধান, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ও বার্মার একমাত্র জাতীয় দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের শীর্ষ নেতা।

সিনিয়র জেনারেল থান শোয়ে। ২০০০ সালের নাফ যুদ্ধের সময় তিনিই ছিলেন ব্রহ্মদেশের সর্বময় ক্ষমতাধর নেতা।

জেনারেল থান শোয়ে ৯ জানুয়ারী রেঙ্গুনে নিযুক্ত বিদেশী সাংবাদিক ও রাষ্ট্রদূতদের তলব করে ঘোষণা করে, বাংলার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবার কোন পরিকল্পনা বার্মার নেই। যে ‘ভুল বোঝাবুঝির’ কারণে সীমান্তে সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্ম হয়েছে, তা নিরসনে তিনি বাংলাদেশের সাথে নিঃস্বার্থ আলোচনার প্রস্তাব দেন।

যুদ্ধ থেকে একতরফা প্রত্যাহারের কারণে ১০ জানুয়ারী নাগাদ যুদ্ধ স্তিমিত হয়ে পড়ে। বার্মার নিঃশর্ত আলোচনার প্রস্তাব গ্রহণ করে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল মংডু গমন করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্মসচিব (রাজনৈতিক) জানিবুল হকের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলে শামিল ছিলেন সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ। শোনা যায়, পরাজয়ের আঘাতে বর্মী কর্মকর্তারা এতোটা ক্ষুব্ধ ছিলেন যে, তারা দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে কোন টাইপ রাইটার সরবরাহেও অসমর্থ থাকে। ফলে হাতে লেখা অঙ্গিকারনামা স্বাক্ষরিত হয়, যাতে ভবিষ্যতে কখনো নাফ নদীতে কোন রূপ বাঁধ নির্মাণের প্রচেষ্টা থেকে বিরত থাকার ওয়াদা করে ব্রহ্মদেশ। এছাড়াও যেকোনো দ্বিপাক্ষিক সমস্যা সমাধানে আলোচনা ও  রাজনৈতিক সমাধানে গুরুত্ব আরোপ করে বার্মা।

নাফ যুদ্ধের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

যুদ্ধের ব্যাপ্তি ও মেয়াদের দিক থেকে নাফ যুদ্ধ স্বল্পস্থায়ী হলেও এই যুদ্ধ একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বিস্তার করে। এই যুদ্ধের পর থেকে সীমান্তরক্ষী বাহিনী পর্যায়ে নিয়মিত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়া শুরু হয়। এই যুদ্ধ দুই শতাধিক বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যের অধিকারী বাংলাদেশ রাইফেলসের গরিমাকে বহুগুনে উন্নীত করে। যুদ্ধে বিজয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন সরকার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক সৈনিককে ‘অপারেশন নাফ পদক’ নামে একটি বীরত্বসূচক তাম্রপদক প্রদান করে। ইতিহাসে প্রথমবার বিডিআর সেনাবাহিনীর অংশীদারি ছাড়াই কোন যুদ্ধে একক বীরত্ব পদক লাভ করে।

অপারেশন নাফ পদক। ছবিটি জেনারেল ফজলুর রহমানের সৌজন্যে প্রাপ্ত। পদকের নাম থেকে আরেক দফা প্রমাণ করা যায় যে, এই যুদ্ধ ছিল একটি অফেন্সিভ যুদ্ধ। আজ যারা নানা পরিসংখ্যান দ্বারা বার্মার সামরিক সক্ষমতাকে বাংলাদেশের উপরে দেখিয়ে আত্মরতিতে মগ্ন, এই মেডেলের ছবিতে তাদের জন্য আছে কঠোর শিক্ষার অনুষঙ্গ।

নাফ যুদ্ধে সবচেয়ে বিরল যে কৃতিত্ব বিডিআর অর্জন করে, তা হচ্ছে শূন্য মৃত্যুহার। তিনদিন ব্যাপী ঘোরতর যুদ্ধে বার্মার তরফে ছয় শতাধিক ব্যক্তি নিহত হলেও বিডিআরে একজনেরও প্রাণহানি ঘটেনি। তবে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহতের ঘটনা ঘটেছিলো। যেকোনো সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে যা বিরল। পুরো যুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিকভাবেও বাংলা ছিল উপরে। ৯ জানুয়ারীর একটি ঘটনা তার প্রমাণ দেয়। সেদিন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল ফজলুর রহমান যুদ্ধক্ষেত্র পরিদর্শনে গিয়ে শত্রুদের অবস্থানের কয়েকশো গজ দূরে অবস্থান নিলে বর্মী সৈন্যরা হাত উঁচিয়ে তাদের সদিচ্ছা প্রকাশ করে, যা একটি অসাধারণ ঘটনা।

এছাড়াও ঐতিহাসিকভাবে ২০০০ সালের নাফ যুদ্ধ একটি অনন্য ঘটনা। ১৬৬৫ সালে শায়েস্তা খান কতৃক চট্টগ্রাম অধিকারের তিন শতাধিক পর এই প্রথম অত্র ভূখণ্ড দিয়ে একটি সামরিক আক্রমণ পরিচালিত হয় ২০০০ সালের জানুয়ারী মাসে। তাছাড়া ১৭৭৬ সালে মেজর জেমস রেনেলের অংকিত সুবা বাংলার মানচিত্র পর্যবেক্ষণে দেখা যায়। মুঘলদের সামরিক বিজয় রামু পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। সেদিক থেকেও নাফ যুদ্ধ ছিল অনন্য, আরেকটি গভীরে সংঘটিত, এবং সম্ভবত একটি নতুন ইতিহাসের সূচনার কথা!

বাংলাদেশ ও ব্রহ্মদেশের সামরিক সক্ষমতার একটি তুলনা

প্রচলিত অর্থে দুটি দেশের সামরিক সক্ষমতার তুলনা যেভাবে করা হয়, সেভাবে আসলে বাস্তবতার বিনির্মাণ হয়না, বরং শিশুতোষ প্রতিযোগিতাতেই সারা হয়। বাংলাদেশের সাথে যেকোনো দেশের সামরিক সক্ষমতার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাদের এই প্রবণতা বাদ দিতে হবে। কোন জাতির সামরিক সক্ষমতার আসল আঁচ পাওয়া যায়, তার ইতিহাসে, জাতিগত প্রাচীনত্ব ও সভ্যতার দিক থেকে। এর থেকেই সমর পরিকল্পকগণ দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে থাকেন। উপরিউল্লেখিত প্রতিটি মানদণ্ডেই বাংলাদেশের চেয়ে বার্মা পিছিয়ে। আর কোন দেশের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় অর্থনীতি একটি প্রধান নিয়ামক। যুদ্ধকালীন অর্থনীতির নিরিখেও নানাভাবে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।

বেশিরভাগ মানুষই সামরিক সক্ষমতার ঢালাও বিচার করেন লোকবলের পরিসংখ্যানের নিরিখে। এটা একদমই অপরিপক্ব একটা ধারণা। লোকবল একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই লোকবলের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে পরিকল্পনা, সেনা মোতায়েনের ধরণ, সৈন্যদের নৈতিক জোর, প্রশিক্ষণ ও সাহস। ধরা যাক, বার্মার যদি ছয় লাখ সেনা থাকে, এবং কেউ যদি সেটা ধর্তব্যে নিয়েই ‘সিকিম সিনড্রোমে’ আক্রান্ত হয়ে পড়ে, তবে তার মানসিক পরিপক্কতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। সৈন্যদের নৈতিক বল, সার্বিক প্রশিক্ষণের কথা বাদ দিলেও বার্মা কি তার ছয় লাখ সৈন্যের সবাইকে অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে উঠিয়ে আরাকানের শীর্ণ ভূখণ্ডে মোতায়েন করবে কিনা, অথবা বাংলাদেশ তার তিন লাখ সৈন্যের সবাইকে কক্সবাজারে এনে বসাবে কিনা, এই প্রশ্নের একটি সাধারণ জ্ঞান-প্রসূত জবাব আছে। তাছাড়া ভৌগলিকভাবেও এই এলাকায় বার্মার সেনা সঞ্চালনার কি কি বাঁধা আছে, সেটাও বিবেচ্য। দশম পদাতিক ডিভিশন দাঁড়িয়ে যাওয়ায় এখন লোকবলের সমীকরণ অনেকটাই বাংলাদেশের অনুকূলে চলে এসেছে।

শেষের কথা

আরাকান সংকটের মুখে বাংলাদেশ যে একটি উপদ্রুত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, তা ক্রমেই স্পষ্ট রূপে প্রতিভাত হচ্ছে। এমতাবস্থায় ভবিষ্যতে পুনরায় বাংলা ও বার্মার মধ্যে সামরিক সংঘাত লেগে যাবার ঝুঁকি ঈশান কোণে স্থাণু হয়ে আছে। এক্ষেত্রে ২০০০ সালের নাফ যুদ্ধ একটি প্রেরণা, বাংলাদেশের সামনে একটি মেছাল। এই যুদ্ধ আমাদের শিক্ষা দেয়, আমাদের দ্বারা কোন কিছুই অসম্ভব নয়। ভবিষ্যতের কথা ভবিষ্যৎ বলতে পারে, তবে ইতিহাসে নাফ যুদ্ধকে তার যোগ্য স্থানেই দিতে হবে। নাফ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা প্রতিটি সৈনিকের বুকে জ্বলজ্বল করা নাফ অপারেশন মেডেল নীরবে কিন্তু সেই কথাই বলে যাচ্ছে…!

Post a Comment

0 Comments